শা স পা সা সা-দের গডফাদার কারা?

রহিম উদ্দিন,
গীতিকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় গর্ব করে লিখেছেন, ” ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা…!”

আহা প্রিয় পৃথিবী, প্রিয় বাংলাদেশ ! আজ তোমার হলো এ কী দুর্গতি! আজ লজ্জা নিয়ে আমারো লিখতে ইচ্ছে হয়, ” চোর-ডাকাত আর প্রতারকে ভরা আমাদের এ বসুন্ধরা, এ বাংলাদেশ ! ”

আজকে, আমাদের এ বঙালদেশের কতিপয় লোকের কুকীর্তি তুলে ধরেই সবার উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলবো। ২০১৯ সালের শেষার্ধো হতে বর্তমান পর্যন্ত বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ দেশে বসবাসকারি এমন কিছু সুনাগরিকের পরিচয় জানতে পেরেছে, যা সত্যিই বিরল। এদের কর্মকাণ্ড, দৈনন্দিন জীবনের হালচাল পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোকেও লজ্জাবনত করতে বাধ্য। প্রথমত, পাঁচজন কুখ্যাত ব্যক্তির পরিচয় পাঠকের সম্মুখে আবারো তুলে ধরতে চাই।

প্রথমেই যে নামটি আমার মনে আসে, সেটা ‘ টাকার কুমির’ খ্যাত জি.কে. শামীম! টেণ্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির অভিযোগে জি. কে. শামীমকে কতিপয় বডিগার্ডসহ আটক করা হলেও তার বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। শুধু কী তাই, অভিযানে জি.কে. শামীমের বাড়ি ও অফিস থেকে নগদ প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা এবং ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর বা আমানতপত্র, মদ ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সামনে আসে, ‘ক্যাসিনো গডফাদার ‘ ইসমাইল হোসেন সম্রাট। যার হাত ধরে দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সহযোগীরা যুবলীগে অনুপ্রবেশ করে। এখানে চাঞ্চল্যকর যে তথ্য সম্রাট জবানবন্দিতে বলেছে তা অনলাইন পত্রিকা মারফত তুলে ধরলাম, ” এজন্য আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাদের তিনি ‘ম্যানেজ’ করেছেন। এছাড়া দলে তার চারজন গডফাদার আছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তাদের নিয়মিত বড় অঙ্কের টাকা দিয়েছেন। গডফাদারদের নাম প্রকাশ করে বলেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন, শুধু আমাকে কেন? তাদের প্রশ্রয়েই আমি বেপরোয়া হয়ে উঠেছি। নেতাদের জিজ্ঞাসা করে দেখেন, ঢাকায় একটি সমাবেশ করতে কত টাকা লাগে। কে দিয়েছে এই টাকা। আমার কাছ থেকেই সবাই টাকা নিয়েছে। ”

তৃতীয়ত,যে নামটি আমাকে নিয়ে আসতে হয়, সেটা, শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউ! বাংলাদেশে প্রথম অনলাইনভিত্তিক যৌন ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম ‘এসকর্ট’ এর কর্ণধার, যুব মহিলা লীগের ( বর্তমান বহিষ্কৃত ) নেত্রী পাপিয়া ওরফে পিউ। রাজনীতিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাপিয়া এটি গড়ে তোলেন। পাপিয়ার সম্পর্কে যা না বললেই নয়, শুধুমাত্র গ্রেফতার হওয়ার আগের, শেষ তিন মাসেই ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলেই যুব মহিলা লীগ নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়া বিল দিয়েছেন এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। সেই হোটেলের প্রেসিডেন্ট স্যুট সব সময় তার নামে বরাদ্দ থাকত। এইছাড়াও, হোটেলটির বারে তিনি প্রতিদিন বিল দিতেন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। অথচ বৈধভাবে তার বার্ষিক আয় মাত্র ১৯ লাখ টাকা। গ্রেফতারের সময় পাপিয়া, পাপিয়ার স্বামী ও সহকারীর কাছে পাওয়া গেছে সাতটি পাসপোর্ট, বাংলাদেশি দুই লাখ ১২ হাজার ২৭০ টাকা, ২৫ হাজার ৬০০ জাল টাকা, ৩১০ ভারতীয় রুপি, ৪২০ শ্রীলঙ্কান মুদ্রা, ১১ হাজার ৯১ মার্কিন ডলার ও সাতটি মোবাইল ফোন। সবচেয়ে যে তথ্যটা আমাদের নজরে আটকে আছে, প্রায় সতেরো শত সুন্দরী রমণী পাপিয়ার অধীনে এসব কাজে জড়িত আছে।

চতুর্থত, যিনি এসেছেন তিনি ‘মহাপ্রতারক’ খ্যাত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম। করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট দেওয়াসহ নানা ভয়াবহ প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত প্রধান পলাতক আসামি। যদিও তাকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সাতক্ষীরা সীমান্তে অস্ত্রসহ গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় সাহেদ করিম আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা। এইছাড়াও, বাংলাদেশের ভিভিআইপি, ভিআইপি, সিআপি, উচ্চপর্যায়ের সামরিক বেসামরিক কর্মকর্তা ছাড়াও এহেন কোন আওয়ামী লীগ এর রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ নেই, যাদের সাথে সাহেদের উঠা বসা নেই। এসব পদ-পদবির পরিচয় ও ক্ষমতা খাটিয়ে এমন কোন প্রতারণা নেই, যা তিনি করেনি।

পঞ্চমুখ হিসেবে যার কথা বলবো, তিনি জেকেজি হেলথ কেয়ারের চেয়ারম্যান, ‘ মুখোশধারী জনগণের সমাজকর্মী ‘ ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী৷ করোনার নমুনা পরীক্ষার নামে প্রতারণার অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। যদিও তার এর বাইরে নানান বিষয়ে নানান অনিয়ম-কুকর্ম বেরিয়ে এসেছে। ব্যক্তিগত জীবনে নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন বিভোর ডা. সাবরিনার এসব কুকর্মের ঢালও সেই আমাদের আওয়ামী রাজনীতির কলাকৌশল, যা ইতোমধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে।

উল্লেখ্য ব্যক্তিবর্গের কর্ম যাইহোক না কেন, কুকর্মের কৌশল যাইহোক না কেন, তাদের মাথার উপর সেই একই ছাতা! তাদের কপালে মাঝখানে সেই একই সার্টিফিকেট ও মনোগ্রাম। এদেশের সব বড় বড় সম্মানি ব্যক্তিরাই তাদের ভ্রাতা! অর্থাৎ, তাদের নিয়ে যতই নাড়াচাড়া করি না কেন, ঘুরেফিরে সেই আওয়ামী লীগ শব্দটাই আসে। আর, এখন আওয়ামী লীগ বলতেই সরকার এটা রাস্তার পাগলেও জানে। সুতরাং, এমতাবস্থায়, ব্যক্তি পর্যায়ের এমনতর শীর্ষ অপকর্ম, দুর্নীতি ও প্রতারণার দায় কে নেবে? সরকার নাকি আওয়ামী লীগ?

আমি যতটুকু জেনেছি, আওয়ামী লীগ এর গঠনতন্ত্রে, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। সন্ত্রাস ও দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গঠন।” এই কথাটি স্পষ্টতই বিদ্যমান আছে। কিন্তু, আমার প্রশ্ন, বাস্তবে আওয়ামী লীগ এই নীতির কতখানি বাস্তবায়ন করছে? জানি, এই বিষয়ে আওয়ামী লীগ এর উত্তর নেই। কিন্তু, আমরা একটা জাগতিক হিসাব থেকে খুব সহজেই বলে দিতে পারি, বর্তমানে আওয়ামী লীগে’র মধ্য কেবল ক্ষমতালাভ, বিরোধীদের নিপিড়ন, প্রতিপত্তি লাভ এসব চর্চা হয়। অন্যথায়, যে বা যারা অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতার হচ্ছে তারা সকলেই আওয়ামী লীগের হতো না। আওয়ামী লীগ এর মত একটা দল কেন, জনগণের সামনে প্রকাশিত হওয়ার পর অভিযুক্ত নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করবে? তাদের রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে কি নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি দমনে অভ্যন্তরীণ কোন অডিট কিংবা নিয়ন্ত্রণ কমিটি নেই? এ যাবত কালে আওয়ামী লীগ দলের নেতাদের যত কুকর্ম বাইরে এসেছে, এক্ষেত্রে কেউ যদি বলে, আওয়ামী এখন একটা শত-ভাগ দুর্নীতি পরায়ণ রাজনৈতিক দল, তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

রাজনৈতিক দল যখন তাদের নিজেদের নেতা-কর্মীদের দুর্নীতি ও অনিয়ম দমনে ব্যর্থ তখনই সামনে আসে দেশের সরকার ও প্রতিষ্ঠান। কিন্তু, এখানে বর্তমান সরকারকে আমরা যতই চেষ্টা করি আওয়ামী লীগ পরিচয় থেকে বের করে আনতে পারি না। কেননা, প্রায় এক যুগ ধরে দেশের শাসন ক্ষমতায় ও সরকারের আসনে আওয়ামী লীগ অসীন। এখানে আমরা স্বীকার করি বা নাই করি, ইতোমধ্যে, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আওয়ামী রাজনীতি মতাদর্শের লোক দেশের সর্বত্র পদায়ন ও নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে। সুতরাং সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এখানে আওয়ামী রাজনৈতিক পরিচয়ের এসব কালপ্রিট দমনে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে। এমতাবস্থায়, সরকার ও আওয়ামী লীগ দুটোই যদি কঠোর না হয়, দুষ্টের দমনে ব্যর্থ হয়, তবে অতিশীঘ্রই সরকার এবং আওয়ামী লীগ দুটোকেই জনগণের কঠিন থেকে কঠিনতর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। যেকোনো মুহুর্তে এ রাজনৈতিক দলকে জনগণ ক্ষমতার মসনদ থেকে নর্দমায় ছুড়ে ফেলতে পারে। তবে একথা অনিস্বীকার্য, রাজনীতির এ দুষ্টচক্র বধে, প্রায়শই, আমরা সরকারের ও আওয়ামী লীগ দলের সদিচ্ছা দেখি, তারা নানা ভঙ্গিমায় সুরারোপিত কন্ঠে ঘোষণা দিয়ে মাঠে নামে, কিন্তু বেচারার অবস্থা এই যে,
” ঘরকে জ্বলি বনমে গেয়ি
বনমে লাগি আগ
বন বেচারা কিয়া করেগি
কর্মে লাগি আগ!”

অর্থাৎ, দেশের স্বাস্থ্য, প্রশাসন, খাদ্য, ধর্ম, রেল, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়গুলোর যেখানেই সরকার দুর্নীতি বন্ধের জন্য হাত দেয়, অমনি বেরিয়ে আসে আওয়ামী লীগ এর নাম, সরকার দলীয় মন্ত্রী এমপিদের নাম! এ যেনো কেঁচো খুঁজতে সাপ বেরিয়ে আসার চিরন্তনী সত্য গল্প।

এক্ষেত্রে সরকারের ও আওয়ামী লীগ এর ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ কী? সরকার কী যাদের নাম বেরিয়ে আসার সম্ভবনা আছে, তাদের সাপের মতো গর্ত থেকে টেনে বের করবে নাকি কয়েকদিন পর নতুন ঘটনার জন্মদিয়ে জাতির সাথে বড় কোনো প্রতারণা করবে, এ বিষয়ে তারাই ভালো জানেন। আমরা যারা আমজনতা, ভাগ্যপোড়া জনগণ, আমাদের এখন একটাই দাবি, আমরা জানতে চাই! শামীম, সম্রাট, পাপিয়া, সাহেদ, সাবরিনাদের গডফাদার কারা?

লেখক: রহিম উদ্দিন
কবি, প্রাবন্ধিক ও সমালোচক।