মানবপাচার রোধ করুন- সাঈদী আলম

সাঈদী আলম,
যারা মানবপাচার করে তাদের আদম ব্যবসায়ী বা দালাল বলা হয়। দালাল চক্রের ইতিবৃত্ত নতুন নয়, অনেক পুরনো। যারা এহেন কর্ম জড়িত থাকেন বা তারা স্বার্থসিদ্ধির জন্যে করে থাকে। পাচারকারী ও পাচারের শিকার উভয়পক্ষের উদ্দেশ্য থাকে অর্থ উপার্জন করা, বৈধ অবৈধ তাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো দালাল চক্র জেনে বুঝে মৃত্যু বা অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেয় সাধারণ কেঠে খাওয়া মানুষের জীবনকে।

মানবপাচারকৃত লোকগুলোকে অল্পে টাকায় বিদেশগমনের অফার দেয়া হয়। বাছ বিচার না করে ভিটে মাটি সর্বস্ব বিক্রি করে। কর্জ দেনা করে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে স্বপ্নের ঠিকানা পাড়ি জমাতে চান। এ পথে কতো কাটা ও প্রতিবন্ধকতা তারা বেমালুম ভুলে যায়। অথবা দালালের খপ্পরে পড়ে অভয় দিয়ে বিপদের মুখে পতিত হন। বাংলাদেশে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জনসংখ্যা পাচার হয়ে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য হলো উন্নত জীবন ও অর্থ উপার্জন করা। জীবনের প্রতি মায়া মমতা ছেড়ে অাত্বীয়- স্বজনের কথা বিবেচনা না করে তারা এপথে পাড়ি জমান। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় দরিদ্র শ্রেণির মানুষ এ কাজগুলো করে থাকে। তারা চায় হঠাৎ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে যাক। মাথায় থাকে হয়তো জিতবো, না হয় মরবো। একসময় বিভিন্ন দেশ শরনার্থী গ্রহণ করতো এখন কিন্তু সীমানা বন্ধ। সেই সাথে সুযোগ পেতো অবৈধ পন্থায় বিদেশ যাত্রীরা ও। দালালের হাত ধরে অনেক মানুষ ইউরোপ,আমেরিকা,মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারা পাড়ি জমাতে চান। যাদের ভাগ্য ভালো হয়তো তারা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমানা অতিক্রম করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পথিমধ্যে অথবা সীমানায় আটকে যায়। কারো জীবনপ্রদীপ এখানেই শেষ আবার কেউ চেষ্টা করে কূলে ভিড়েন। ধন সম্পদ তো গেলো গেলোই জীবনটাইও গেল। বউ বাচ্চার আর্তনাদ কি দালালের কানে পৌঁছে? সাম্প্রতি লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশী হত্যা আলোচনার টপ লাইনে চলে এসেছে।

এভাবে আরো কত জনকে বিভিন্ন দেশে অনিশ্চা সত্তেও মৃত্যুর অমিয়সুধা পান করতে হচ্ছে এ হিসাব কারো কাছে নেই। বেশ কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় এ প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেছে। শুনতাম যে, দালালের খপ্পরে পড়ে এমন কিছু লোক যেতে চায় স্বপ্নের মালয়েশিয়ায়। দালাল তাদেরকে বাঁশখালী ছনুয়াতে গিয়ে মালয়েশিয়া বলে ছেড়ে দেয়।এর চেয়ে মর্মান্তিক হলো দু এক বছর আগের ঘটনা এক অাত্বীয় কিছু টাকা দেনা করে মালয়েশিয়া চলে যাচ্ছে সাগর পথে। দু’ একদিন খোঁজ খবর ছিল। এরপর থেকে টানা পাঁচ, ছ’মাস ফোন বন্ধ কোন ধরণের যোগাযোগ খবরাখবর নেই। পরিবারে নানান দিক থেকে খবর আসতেছে এরকম অনেকে নাকি মারা গেছে। পরিবারে ধরে নিয়েছে তিনি হয়তো আর নেই। পাঁচ মাস পরে জেলখানা থেকে আরেক বন্দীর মাধ্যমে খবর আসছে সেও নাকি জেলখানায়। সে যখন পরবর্তীতে ফিরে এসেছে বর্ণনা করতেছে ফেলে আসা এক হ্রদয় বিদারক ঘটনা। সাগরের মাঝপথে যখন গেছে টাকার জন্যে চাপাচাপি করছে। শিখানো ভাষায় বউ বাচ্চাকে অসহায় কন্ঠে ফোন করতে বাধ্য করে, যারা টাকা পয়সা পাঠায় ভিটে মাটি বিক্রি করে প্রিয় মানুষকে উদ্ধার করতে তারা কোন রকম নিস্তার পায় অত্যাচার থেকে। যারা টাকা পয়সা দিতে ব্যর্থ হন তাদের উপর খড়গহস্তে নেমে আসে অকথ্য নির্যাতন। অনেককে সাগরে ফেলে দেয় আবার কাউকে সাগরের মাঝপথে ছেড়ে দেয়। যারা পারছে জীবনটা কোন রকম বাঁচাতে তারা পরে চলে আসতেছে দেশে। বাকিদের সলিল সমাধি হচ্ছে। এভাবে অনেকের জীবন স্বপ্নের মালয়েশিয়ায় পৌঁছার আগে জীবনের অন্তিম মূহুর্তে চলে আসে। কেউ মালয়েশিয়া পৌঁছল ঠিকই মালয় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেলখানায় বুক চাপা দিতে হল। এভাবে দালাল চক্র সাধারণ মানুষকে ভুলবাল বুঝিয়ে জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। প্রতিটি সেক্টরে সেক্টরে বসে আছে মানবপাচারকারী গ্রুপ। এই আদম ব্যবসায়ীরা জলদস্যুর মত মানুষের জীবনকে জিম্মি করে রাখছে। এই আদমপাচার রোধ করতে হলে সাধারণ মানুষ খুব বেশি সচেতন হতে হবে। অবৈধ পন্থায় ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশগমন নয়। বরঞ্চ অনিশ্চয়তার পথে গমন করা। বৈধ পন্থায় বিদেশগমন করুন। দালাল চক্রকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে সহায়তা করুন। দালাল চক্রের ব্যাপারে সরকারের উচিত হবে যথাযথ আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা। সচেতনতা বাড়ানো। মনে রাখতে হবে, জীবিকার আগে জীবন বড়। মানবপাচারেরা দেশ ও মানুষের শত্রু। এদের হাতে নিরাপদ নয় মানুষের জীবন। নিজে সচেতন হোন,অন্যকে সচেতন করুন।

শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক