“পাহাড় ধসের ইতিবৃত্ত ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়”- রহিম উদ্দিন

“পাহাড় ধসের ইতিবৃত্ত ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়”

রহিম উদ্দিন,
ঋতুবৈচিত্রের এই বাংলাদেশে আষাঢ়-শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। আর,বর্ষাকাল এলেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম জেলাসহ অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলসমূহে পাহাড় ধসের মত দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পাহাড় ধস নিয়ে লিখতে বসেই ভারতীয় একটা চলচিত্রের কথা মনে এলো। ২০১৫ সালের অগাস্টে এই হিন্দি চলচ্চিত্র, ‘ মাঝি-দ্য মাউন্টেন ম্যান’ মুক্তি পায়। চলচিত্রের মূল কাহিনী হলো, ভারতের বিহারের গয়া নিকটবর্তী গেহলৌরের গরিব শ্রমিক দশরথ মাঝির জীবনী। যিনি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে একক প্রচেষ্টায় ছেনি দিয়ে কেটে একটি পাহাড়ি ঢিবির মাঝ দিয়ে ১১০ মিটার দীর্ঘ, ৯.১ মিটার প্রস্থ ও ৭.৬ মিটার গভীরতা সম্পন্ন পথ নির্মাণ করেন। মাঝির বানানো এই সড়ক ভারতের আতরি ও ওয়াজিগঞ্জের দূরত্ব ৫৫ কিমি থেকে কমিয়ে মাত্র ১৫ কিমিতে পরিণত করে। আমার জানামতে, এর মতো মহৎ কাজের জন্য পাহাড় কাটার ঘটনা আর দ্বিতীয়টি নেই। গল্পটি এখানে বলার মহত্ত্ব শেষের দিক। আসুন, মূলে ফিরে আসি। পাহাড় ধস বাংলাদেশে এখন রীতিমতো ভীতির কারণ। কথা হচ্ছে পাহাড় ধস কেন ঘটে এবং এর থেকে বাচার উপায় কী? বাংলাদেশে পাহাড় ধসের অন্যতম প্রধান কারণ পাহাড় কাটা। সুতরাং, প্রথমেই জেনে নিই; পাহাড়া ধসের কারণ গুলো কী কী এবং প্রতিকারের উপায়।

২০১৮ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে, শফিকুল ইসলাম শিমুল এমপিকে আহ্বায়ক ও অন্যান্য চার সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত সাব-কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী পাহাড় ধসের কারণ ও প্রতিকারের উপায় সমূহর সার-সংক্ষেপ নিম্নরূপ -কারণ গুলোর মধ্যে রয়েছে, ১।অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত ও মৃদু ভূমিকম্পের কারণে পাহাড় ধসে পড়ে। ২। মাটিখেকোদের পাহাড় কাটার কারণে পাহাড়ে ধসের সৃষ্টি হয়। ৩। পাহাড়ি এলাকায় গড়ে উঠা ইটের ভাটাও পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ। ৪। পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ বসতি স্থাপন ও অপরিকল্পিতভাবে অবকাঠামো এবং নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে পাহাড় ধস ঘটে। এবং ৫। দুর্বল মাটির গঠন ও শক্তিশালী ভূমিকম্প।

সাব-কমিটির মতে, পাহাড় ধস হতে প্রতিকারের উপায় গুলোর মধ্যে রয়েছে, ১। পাহাড়ে বসবাসকারী ছিন্নমূল মানুষদের জন্য সমতলে স্থায়ী আবাসন নির্মাণের জায়গা নির্ধারণ করা। ২। রাঙামাটি জেলায় আশ্রয়হীন এবং যারা পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে তাদের জন্য ছোট ছোট টিলাগুলো সমতল করে সেখানে তাদের বসবাসের জন্য সরকারি অর্থায়নে স্থায়ীভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করা। ৩। পাহাড়ের পাদদেশে নতুন করে ঘরবাড়ি নির্মাণ বন্ধ করা। ৪। পাহাড়ে অধিক পরিমাণে পরিবেশবান্ধব এবং পাহাড় রক্ষাকারী বৃক্ষ ও বাঁশ রোপণ করা। ৫। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশের পাহাড়গুলোতে যে কোনো ধরনের স্থাপনা তৈরির অনুমতি সম্পূর্ণভাবে রহিত করা এবং বর্তমান স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে নিরাপদ ও দূরবর্তী স্থানে স্থানান্তর করা। ৬। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করা। ৭। পাহাড় থেকে মাটি কেটে ও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানো বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে; এসবের বাস্তবায়ন কতদুর? নাকি প্রতিবার বর্ষা এলেই কমিটি হবে আর প্রতিবেদন ও সুপারিশ হবে; এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে পাহাড় ধস! সেই বিচার ও জবাব আপনাদের কাছেই থাক।

পাহাড় ধসের এসব কারণ ও প্রতিকার সবার জানা থাকা সত্ত্বেও এইজন্য বলা, যদি নতুন করে কোন ভূমিধস ঘটে তবে সরকার যেন কারণ না খুঁজে এইগুলোই বাস্তবায়ন করে। সে যাক, এবার অজনা কিছু বলি। বাংলাদেশে পাহাড় ধসের ঘটনা আজকে নতুন নয়। সম্ভবত, ১৯৬৮ সালে কাপ্তাইচন্দ্রঘোনা রাস্তায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্রথম বড় পাহাড় ধস ঘটে। এরপর, ১৯৭০ সালে ঘাগড়া-রাঙ্গামাটি রাস্তায় একইভাবে পাহাড় ধস ঘটে। ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে বান্দরবানের চড়াইপাড়াতে বিশাল পাহাড় ধস ঘটে। ১৯৯৯ সালের ১১ ও ১৩ আগস্ট দুটি পাহাড় ধস ঘটে। এতে চট্টগ্রাম জেলায় ১০ জন ও বান্দরবান জেলায় ৭ জন মারা যান। ২০০০ সালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও শহরের অন্যান্য জায়গায় কমপক্ষে ১৩ জন পাহাড় ধসে নিহত হয়। ২০০৭ সালের ১০ ও ১১ জুন প্রবল বর্ষণের জন্য পাহাড় ধস হলে, এতে চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে একযোগে প্রায় ১২৭ জন লোক নিহত হয়।২০০৮ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের লালখান বাজার এলাকায় পাহাড় ধসে ১১ জনের মৃত্যু হয়।একই সালে বান্দরবন শহরের বালুচরা এলাকায় পাহাড় ধসে ১৩০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে মারা যান আরো ছয় জন। ২০১১ সালে চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকায় একই পরিবারের পাঁচজন সহ ১৭ জন মারা যান পাহাড়ের মাটি চাপায়। ২০১২ সালের ১২ জুন চট্টগ্রাম নগরীর চার স্থানে পাহাড়ধসে ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে।
২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের ইস্পাহানী মোড় এলাকায় পাহাড় ধসে এক গৃহবধূ মারা যান। একই বছর ২৯ জুলাই পাহাড় ধসে এক মেয়ের করুণ মৃত্যু হয়। ২০১৫ সালে পাহাড় ধসে চট্টগ্রাম জেলায় মারা যান আরো ছয় জন। ২০১৬ সালে পাহাড় ধসে কক্সবাজারে মারা যান ১৭ জন। ২০১৭ সালে পার্বত্যাঞ্চলের তিন জেলায় প্রাণহানির সংখ্যা এককভাবে দেড় শতাধিক। যার মধ্যে শুধু রাঙ্গামাটিতেই মৃত্যু হয়েছে ১১০ জনের।২০১৮ সালের ১২ জুন রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় প্রবল বর্ষণে পাহাড় ধসের ঘটনায় মৃত্যু হয় ১১ জনের । একই সালের ১৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরীর ফয়’স লেকে পাহাড় ধসে মারা যায় একই পরিবারের তিনজনসহ মোট ৪ জন। এইছাড়াও ২০১৯ সালে টেকনাফ, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প, কাপ্তাই, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি সহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসে প্রায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। এসব সংখ্যা চাইলেই হিসাব করা যায়,যাবে। কিন্তু, সেসব পরিবারের সবাই মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে, যাদের কেউ খোঁজার নেই তাদের সংখ্যাটা কত হতে পারে কে জানে! এদের জীবনের মূল্যটাই বা কোথায়?

যাইহোক, কথায় আছে, ‘আশায় বাঁচে মানুষ!’ এতো কিছুর পরও আমরা আশায় আছি, সরকারের পরিবেশ ও দূর্যোগ মন্ত্রনালয় আমাদের আশা দেখিয়েছে। ২০১০ সালের,’ বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫’ সংশোধন করে ৬(খ) ধারায় পাহাড় কাটায় বাধা-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া ‘ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরকারি বা আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন বা দখলাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না।’ কেউ যদি তা করে, শাস্তিস্বরূপ, ধারাদণ্ড ১৫(১) অনুযায়ী তাকে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড- বা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড- বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।

এইছাড়াও ২০১২ সালের ‘ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে’র ২(১১) ধারায় ভূমি বা পাহাড় ধসকে ‘দুর্যোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে, ২(১৩)(ই) ধারায় যে কোনো দুর্যোগ বিষয়ে আগাম সতর্কতা, হুঁশিয়ারি, বিপদ বা মহাবিপদ সংকেত প্রদান ও প্রচারের বাধ্যবাধকতা সংযোজিত করা হয়েছে। তা না হলে ৪৪ ধারা বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য শৃঙ্খলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, একই আইনের ৩৪ ধারা বলে, দুর্যোগের আগাম সংকেত বা প্রস্তুতি বা জনসচেতনতা-বিষয়ক তথ্য, চিত্র বা সংবাদ প্রকাশ, প্রচার ও প্রদর্শনের জন্য সরকার রেডিও, টিভি, পত্রিকা, স্যাটেলাইট চ্যানেলসহ যে কোনো গণমাধ্যমকে নির্দেশ দেবে এবং গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ তা পালনে বাধ্যথাকবে। তা না হলে দণ্ডধারা ৪২ অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা জরিমানা করার কথা বলা হয়েছে।

হায় রে আইন! তোমার এতো ধারা! এতো ক্ষমতা! অথচ, পাহাড় ধস বন্ধে প্রচার-প্রচারণা ও বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে তুমি ; কতো নিরব! কতো অসহায়! সরকার ও মিডিয়া প্রতিষ্ঠান সমূহের উচিত, অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন ও মহামারী করোনার মতো এখন থেকে নিয়মিত পাহাড় ধসের ব্যাপার মানুষকে সচেতন করতে প্রচার-প্রচারণা চালানো। মন্ত্রণালয়গুলো পাহাড় ধসের ক্ষয়ক্ষতি হতে বাঁচার জন্য এখনই জোর প্রস্তুতি ও প্রচার-প্রচারণা চালানোর আশু পদক্ষেপ নিলে মানুষের জান-মাল অনেকাংশে রক্ষা পায়। পরিশেষে, আবার সেই দশরথ মাঝির গল্প দিয়ে শেষ করবো, দশরথ মাঝি তার এই মহৎ কাজের জন্য প্রশংসিত হয়েছে। ভারত সরকার তাকে সম্মানিত করেছে। কিন্তু, আমাদের দেশের প্রকৃতির শত্রু, মাটিখেকো, ভূমিদস্য, যারা প্রতিবছর অগণিত মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, দূর্যোগ মন্ত্রনালয়ের কাছে আমাদের প্রশ্ন, তাদের বিরুদ্ধে এতো এতো আইন থাকা সত্ত্বেও কোন ব্যবস্থা নিচ্ছি না কেন? তবে, নির্বিচারে পাহাড় কাটাও কি দশরথ মাঝির পাহাড় কাটে রাস্তা বানানোর মহৎ কাজ?

রহিম উদ্দিন
কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।