“করোনার সাথে সম্মুখ যুদ্ধ”- রহিম উদ্দিন

“করোনার সাথে সম্মুখ যুদ্ধ”

এক.
আমি এমন এক সময় ও বিষয় নিয়ে লিখতে বসেছি, যে সময়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম গুলো ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করছে, দেশে করোনায় আরো চল্লিশ জনের মৃত্যু। যদিও ইতোপূর্বে আমরা প্রায় ছয়শতাধিক আত্মার-আত্মীয়কে হারিয়েছি। এর মধ্যে কিছু মৃত্যু আমাদের এতটাই নাড়া দিয়ে গেছে যে, আমাদের চোখেমুখে কেবল অপরাগতার ছাপ, ডা. মঈন তাদের মধ্যে অন্যতম।এইছাড়াও এই করোনাকালে কোভিড-১৯ কিংবা অন্যান্য রোগব্যাধির কারণেও জাতীয় অধ্যাপক ড.আনিসুজ্জামানসহ অনেক রথী-মহারথীকে হারিয়েছি। বর্তমানে আমরা এমন এক দুঃসময় পার করছি যে, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এক হয়ে শেষ বিদায় পর্যন্ত জানাতে পারছি না। এমতাবস্থায়, আমাদের অনুভূতি কেবল এতটুকু;
আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার / বুকের ব্যথা বুকে চাপিয়া নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার! এই ধিক আমাদের অপরাগতা, দেশের নিয়মকানুন, রাজনীতি, সরকারব্যবস্থা সর্বোপরি গণতন্ত্রের প্রতি!

দুই.
এবার বিষয়ে ফিরে আসা যাক। সরকার ইতোমধ্যে কিছু নির্দেশনা সমেত অফিস-আদালত ও অন্যান্য সব বিষয় স্বাভাবিক করে দিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে আমরা করোনার সাথে সম্মুখ যুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। দেশে যখন করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রুপ নিচ্ছে ঠিক সেই মুহুর্তে সরকার কেন এমন সিদ্ধান্ত নিল সেটা সরকারই ভালো জানে। যদিও সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী বললো, ‘সরকার ও সরকার প্রধান বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমেই এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’ অর্থাৎ, তিনি স্পষ্টতই বুঝাতে চেয়েছেন এই সিদ্ধান্ত সরকারের একার না এবং এটা সবাইকে মানতে হবেই। অবশ্যই নিদানপক্ষে এই নিয়ে সরকার ও সিদ্ধান্তের বিপক্ষে কথা বলা আর জলঘোলা করে তা পান করা সামিল। আমি আপনি পরিস্থিতি কিংবা দেশ নিয়ে যা-ই বলি না কেন, সরকারের আসনে বসলেই বুঝা যায়, আসলে প্রেক্ষাপট কী! কোথায় কী আছে! কী নেই! কেননা, ইতোমধ্যে সরকারের উপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের মত প্রাকৃতিক দূর্যোগও বয়েগেছে। এহেনবস্থায়, আমাদের সকলের উচিত সরকারি সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে সর্বপরি একসাথে কাজ করা। যেহেতু, অফিস আদালত চালু হয়েগেছে, চাকরিজীবী, শ্রমজীবীরা রাস্তায় আজকে থেকে বের হয়েছে, সেহেতু করোনা সংক্রমণের যা হওয়ার তাই হয়েগেছে কিংবা হয়ে যাবে। ফলশ্রুতিতে, বাঁচতে হলে আমাদের সকলেরই প্রাতিষ্ঠানিক, পারিবারিক কিংবা ব্যক্তিগত সুরক্ষার একটাই মন্ত্র,’ ইয়া নাফসি!’ তথা, সামাজিক ও ব্যক্তিগত দূরত্ব, হাত ধোয়া, মাস্ক ও পিপিই পরিধান, সর্বোপরি সতর্ক থাকা। কথায় আছে, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। সুতরাং, করোনা যুদ্ধে সচেতন হয়ে নিজে বেঁচে থাকলেই যেকোনো সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে বলতে পারবেন। অতপর,আগে বাঁচুন, তারপর সমালোচনা।

তিন.
সরকার আজকে থেকে অফিস আদালত খুলেছে,আগামীকাল থেকে গণপরিবহন খুলে দিবে। দীর্ঘ ছেষট্টি দিন পর, আজকে রাস্তাঘাট, অফিসে আদালতে মানুষের স্বাস্থ্য বিধি মানার চিত্র বা সম্ভাব্যতা দেখলাম, হলফ করেই বলতে পারি; অচিরেই আমরা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। তদুপরি বলি, সবকিছু চালু ও বন্ধ করা সরকারের পক্ষেই সম্ভব। সরকারের সেই ক্ষমতা আছে। একই সাথে যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের ক্ষমতাও সরকারের আছে, প্রয়োজন শুধুমাত্র সুমতি ও সুকৌশল। আশাকরি, সরকার স্বাস্থ্যবিধি গুলো মানতে প্রতিটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করবে, প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও সামরিক বাহিনীর সাহায্য নিবে, অন্যথায়, আসন্ন ভয়াবহ করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি অবস্থার মত কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে পিছপা হবেন না। পাঠক এই যখন করোনা পরিস্থিতি, তখন ভিন্ন বিষয় নিয়ে কয়েকটি কথা বলেই শেষ করবো। অফিস আদালত যখন খুলে দিয়েছে তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়েও নানা প্রশ্ন ও কথা উঠেছে। কখন কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করবে সেই বিষয়েও আশাকরি, সরকার ও তার বিশেষজ্ঞরা যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিবেন। আপনারা অবগত আছেন, গত ১৭ মার্চ ২০২০ খ্রিস্টাব্দ হতে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এরি মধ্যে কত কী ঘটেগেছে তার ইয়ত্তা নেই। কেউ কেউ অনলাইনে, টিভি চ্যানেলেও পড়িয়েছে, পড়েছে,পরীক্ষার কথাও বলেছে। সবকিছুই সেই টেলিভিশনের সাথে তারাবীর সালাত আদায়ের মত গোলেমেলে মনে হয়েছে। তবে, পিছিয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে আমাদের করণীয় কী? এই সম্পর্কে পরামর্শ ও প্রস্তাবনা মূলক প্রবন্ধ, ‘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর আগে ও পরে ‘র কিছু অংশ উল্লেখ করেই ইতি টানবো।

১৯৭১ সালে স্বাধীন হওয়া আমাদের এই দেশ বেশ এগিয়েছে একথা অস্বীকার করার মত ইচ্ছে কী সাধ্য কোনটাই আমার নেই। দেশের এই অগ্রগতির গতিকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারতো আমাদের শিক্ষানীতি, কিন্তু তা হলো না, তারপরও আমরা হেলেদুলে বেশ কিছুদূর এগিয়েছি এটাই সস্তি। যাইহোক, শিক্ষানীতি নিয়ে আমার আরো একটা দীর্ঘ আলোচনা আছে, আমি বরং করোনাকালের শিক্ষানীতি নিয়েই এখানে লিখছি। আমাদের দেশও এখন ডিজিটাল বাংলাদেশ। এখানেও হতে পারতো প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রজেক্টর নির্ভর, অনলাইন ভিত্তিক, কিন্তু করি করি করে, হই হই বলেও কিছুই হলো না। যার ফল, শিক্ষা কার্যক্রমে আজকের স্থবিরতা। এই ক্ষতি ও পিছিয়ে পড়া রুখে দিতে, পরবর্তীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালুর আগে ও পরে আমাদের নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি মনে করি।

১। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ করা।
২। অনলাইন ও দূরদর্শন ব্যবস্থার মাধ্যমে পাঠদানের বিষয়ে প্রতিটি শিক্ষক/শিক্ষিকা প্রশিক্ষণ প্রদান করা।
৩। বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ‘ওপেন বুক এক্সাম ‘ ব্যবস্থাও চালু করা।
৪। সারাদেশে একযোগে অথবা পর্যায়ক্রমে অনলাইন ভিত্তিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা।
৫। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি দুইশত জন শিক্ষার্থীর জন্য প্রতি ফ্লোরে ফ্লোরে হাত ধৌত করার জন্য বেসিন ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা,যাতে ক্লাস চলাকালীন সময়ের মধ্যে যেকোন শিক্ষার্থী নাক,মুখ ও চোখ স্পর্শ করার পূর্বে খুব সহজেই হাত পরিস্কার করতে পারে।
৬। স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নের জন্য স্কাউট তথা পর্যায়ক্রমে সাধারণ ছাত্র-শিক্ষকের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা।
৭। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফটকে জীবানুনাশক স্প্রে মেশিন ও তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা করা।
৮। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত, ক্লাস চালুকালীন সময়ের একজন ডাক্তারকে সার্বক্ষণিক মজুদ রাখা।
৯। লকডাউন তথা করোনাকালীন সময়ে যে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি, তা বাদ দিয়ে সল্প সময়ে পরবর্তী ধাপের জন্য নির্দিষ্ট বই,বিষয় ও সিলেবাস শেষ করে চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা।
১০। সরকারি চাকরিতে যোগদানের বয়সসীমা আরো এক বছর বৃদ্ধি করা, যাতে ইতোমধ্যে যে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত ছিলো কিংবা আরো যতদিন নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকে, সেই ক্ষতি ছাত্ররা পুষিয়ে নিতে পারে।

তালে তালে অনেক কথাই বলে ফেললাম, আরো অনেক কথাই বলার আছে। হয়তো অন্য আরেকদিন সবিস্তারে বলবো। ততদিন ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সরকারের প্রতি আস্থাশীল থাকুন।

লেখক:
কবি ও প্রাবন্ধিক