হ্যাট্রিক, ওয়ানডে ইতিহাসে নাম্বার ওয়ান তাইজুল

ইমতিয়াজ চৌধুরী, খেলাধুলা ডেস্কঃ
ওয়ানডে ক্রিকেটে হ্যাটট্রিকের তালিকাটা বেশ লম্বা। সেখানে তাইজুল ইসলামের অবস্থান ৩১ নম্বরে। অর্থাৎ, ৩১তম বোলার হিসেবে ওয়ানডেতে হ্যাটট্রিক করেছেন তিনি। সংখ্যাটিতে নিশ্চয়ই মাহাত্ম্য নেই। কিন্তু তাইজুলের হ্যাটট্রিকে বিরাট মাহাত্ম্য আছে। যেখানে তাইজুল সেরা, এক নম্বর। ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে অভিষেক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন বাংলাদেশের বাঁহাতি এই স্পিনার।

ওয়ানডে ক্রিকেটের ৪৯ বছরের ইতিহাসে মাত্র চারজন বোলার অভিষেকে হ্যাটট্রিকের দেখা পেয়েছেন। যার শুরুটা তাইজুলের হাত ধরে। বাঁহাতি এই স্পিনার রেকর্ড বইয়ে নতুন পাতা যোগ করার পর সেখানে নাম তুলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাদা এবং শ্রীলঙ্কার দুই বোলার ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গা ও শেহান মাধুশঙ্কা।

টেস্টের নিয়মিত সদস্য তাইজুলের হঠাৎই ওয়ানডে অভিষেক হয়ে যায়। হঠাৎ অভিষেক হলেও তাইজুল তার শুরুর পর্ব রাঙিয়ে তোলেন। ২০১৪ সালে মিরপুরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচে ৭ ওভারে মাত্র ১১ রান খরচায় হ্যাটট্রিকসহ চার উকেট নিয়ে জেতেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার।

২৭তম ওভারের শেষ বলে তিনাশে পানিয়াঙ্গারার স্টাম্প উপড়ে নিলেও তাইজুলের মনে তখন হ্যাটট্রিকের ভাবনা আসেনি। নিজের পরের ওভারটি করতে এসে প্রথম বলেই ফেরান জন নাইউম্বুকে। দুই বলে দুই উইকেট; সতীর্থরা এগিয়ে এসে বুদ্ধি ও সাহস যোগাচ্ছিলেন।

তাইজুল অবশ্য অত ভাবেননি। স্বাভাবিক একটি ডেলিভারিই করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার স্বাভাবিক ডেলিভারিটিই টেন্ডাই চাতারার জন্য হয়ে ওঠে মরন কামড়, ভেঙে যায় তার স্টাম্প। জিম্বাবুয়ে পেসারকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের চতুর্থ বোলার হিসেবে ওয়ানডে হ্যাটট্রিক পূরণ করেন তাইজুল। সেই গল্প শোনা যাক তাইজুলের মুখেই।

তাইজুল ইসলাম: হ্যাটট্রিক দারুণ একটা ব্যাপার। এর অনুভূতিটা একদম আলাদা। এই অনভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। তার ওপর আমি আবার অভিষেক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেছিলাম। সব মিলিয়ে দারুণ এক অভিজ্ঞতা ছিল। সতীর্থ থেকে শুরু করে সবাই খুব খুশি ছিল। সবাই অভিনন্দন জানিয়েছিল। হ্যাটট্রিক অন্যরকম, হ্যাটট্রিকের তুলনা হ্যাটট্রিকই।

আমার ওয়ানডে অভিষেক এমন হবে, সেটা আসলে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। ঘোর লাগা অনুভূতি কাজ করছিল। সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ চাইলে সবই সম্ভব। সেই ম্যাচে আমি প্রথম ৪-৫ ওভারে কোনো উইকেট পাইনি। তখন কেউ চিন্তাও করেনি হ্যাটট্রিক হবে।

এরপর ষষ্ঠ ওভার যখন করি, হ্যাটট্রিক হয়ে যায়। ক্রিকেটে আসলে হঠাৎ করে অনেক কিছুই হয়ে যায়। হ্যাটট্রিকটা তেমনই। কারণ আপনি বলে-কয়ে হ্যাটট্রিক করতে পারবেন না। এটা সময় হয় না। হ্যাটট্রিক আসলে হয়ে যায়। অনেক বোলারই টানা দুই উইকেট নিয়েছেন, বারবার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তাদের হ্যাটট্রিক হয়নি। আমরটা হয়ে গেছে।

আগের ওভারের শেষ বলে তিনাশে পানিয়াঙ্গারেকে আউট করি। ওকে বোল্ড করেছিলাম। পরের ওভারের প্রথম জন নাইউম্বুকে আউট করি। যখন দুই বলে দুই উইকেট পেয়ে গেলাম, তখন একটু নার্ভাস হয়ে যাই। সব বোলারের ক্ষেত্রেই এমন হয় বলে আমার বিশ্বাস।

মুশফিক ভাই উইকেটের পেছেনে ছিলেন। বাকি যারা ছিল, কেউই চাপ বা ভরকে দেয়নি। সবাই সাহস দিচ্ছিল যে, স্বাভাবিক বোলিং করলেই হবে। সত্যি বলতে দুই উইকেট পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। হ্যাটট্রিক বলটি করার আগে মাশরাফি ভাইয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। ভাইও স্বাভাবিক বোলিং করতে বলছিলেন। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে করেছি, হয়ে গেছে।

ওই দিনটা হয়তো আমার জন্যই রেখেছিলেন আল্লাহ। অভিষেক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক। হ্যাটট্রিকসহ ৪ আউকেট, ম্যাচ সেরার পুরস্কার জেতা; সব মিলিয়ে দিনটা আমারই ছিল। আমার ক্যারিয়ারের দারুণ একটা দিন ওটা। বলা যায় সবই আমার পক্ষে ছিল। যেমন চেয়েছি, তেমনই হয়ে গেছে।

হ্যাটট্রিক সবাই করতে পারে না বা হয় না। একটা বোলার জানে না, আমি জীবনে হ্যাটট্রিক করতে পারব কিনা। এটা সবার কপালে আসেও না। হ্যাটট্রিক একজন বোলারের কাছে রোমাঞ্চকর একটা ব্যাপার। হ্যাটট্রিক করলে কেমন অনুভূতি কাজ করে, সেটা বলে বোঝানো কঠিন।

যতদিন ওয়ানডে ক্রিকেট থাকবে, ততদিন আমার নামটা প্রথমে থাকবে অভিষেক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করার জন্য। ওই ম্যাচ, হ্যাটট্রিকের কথা মনে পড়লে ভালো লাগে। ইউটিউবে পাওয়া যায়, মাঝেমধ্যেই দেখি।

আমি আগেও হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা তৈরি করেছি। দেখা গেছে আমি টানা দুটি উইকেট পেয়েছি, কিন্তু তৃতীয় বলে আর উইকেট পাইনি। আগে অনেক ম্যাচেই এমন হয়েছে। হতে হতে হয়নি, এটায় হ্যাটট্রিক না করার বেদনা বাড়ায়। অনেকের ক্ষেত্রেই এমন হয়। না করতে পারার একটা অনুভূতি, আর করতে পারার আরেকটা।

হ্যাটট্রিক সব সময়ই হ্যাটট্রিক, সেটা যেভাবেই হোক। আমার কাছে এমনই মনে হয়। কে আউট হলো, কাকে আউট করলাম, এটা বড় ব্যাপার নয়। হ্যাটট্রিকে এসব ব্যাপার দেখার সুযোগ নেই। আমার সেরা তিন পারফরম্যান্সের মধ্যে হ্যাটট্রিককে রাখব। এটাকে আমি এক নম্বরে রাখতে চাই।

ওয়ানডেতে হয়েছে, টেস্টেও যদি একটা হ্যাটট্রিক হয়; এরচেয়ে ভালো কিছু আর হতে পারে না। টেস্টেও হ্যাটট্রিক করার ইচ্ছা আছে। অবশ্যই চেষ্টা করব, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here