সেতুর অভাব এক’টির, দুর্ভোগ লাখো মানুষের

এম এ সাত্তার, কক্সবাজার:
বাঁকখালী নদীর উপর একটি সেতুর অভাবে যুগ যুগ ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কক্সবাজার সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের প্রায় লাখো মানুষের।নদীর ওপর সেতু নির্মিত না হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার এই সব লাখো মানুষ।আর সে কারণে দীর্ঘদিনের চাওয়া বাস্তবায়নে আন্দোলনে নামছেন স্থানীয়রা।

সদর উপজেলার পিএমখালী ও ইউনিয়নের ছনখোলা -ঝিলংজা এলাকা ঘেঁষে গেছে বাঁকখালী নদী। পিএমখালী ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ডের ছনখোলা এলাকার খেয়াঘাটে সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ।

ওই ঘাটে নদী পারাপারের একমাত্র মাধ্যম নৌকা।
আর একটি মাত্র নৌকা থাকলেও তা সব সময় থাকে না। ফলে, প্রতিনিয়ত অসুবিধায় পড়তে হয় ঘাট দিয়ে চলাচলকারী খুরুশকুল (একাংশ) পিএমখালী ,ভারুয়াখালী, ইউনিয়নের মানুষকে।
এই নদী পারাপারে সেতু না থাকায় এসব গ্রামের মানুষেরা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন কক্সবাজার পৌরশহর থেকে।

ব্যবসায়ী আব্দুর রহমান সোহেল বলেন, এই নদীটি আমাদের জন্য অভিশাপ। এখানে একটি সেতুর অভাবে আমরা আমাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাইনা। সময়মতো বাজারজাত করতে না পারায় প্রায়ই ফসল নষ্ট হয়ে যায়। মালামাল আনানেয়াতে দ্বিগুণ খরচ পড়ে। যে কারণে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ছনখোলা পশ্চিম পাড়া এলাকার মোহাম্মদ ইউসুফ উল্লাহ বলেন,৮/১০ দিন আগে রাতে হঠাৎ করে আমার এক নিকত্মীয় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার উদ্দেশে ঘাটে আসলে, সেখানে কোনো নৌকা না থাকায় রোগীকে আর হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে, বাধ্য হয়ে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক দিয়ে তার চিকিৎসা করানো হয়, যার কারণে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে দুইদিন পর রোগী মারা যায়।

কক্সবাজার সরকারি কলেজ, সিটি কলেজ, সরকারি বালক বিদ্যালয়, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী বলেন, বর্ষাকালে প্রায়ই আমরা স্কুলে যেতে পারিনা। ঘাটে নৌকা না থাকায় নদী পার হওয়া সম্ভব হয় না। কখনো নৌকা পেলেও স্কুলে যেতে দেরি হয়। তাছাড়া নৌকা উল্টে প্রায়ই আমাদের বই-খাতা ও স্কুলের পোশাক ভিজে যায়। প্রতিবছর এই ঘাটে নৌদুর্ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। গত ১/২ মাসের ব্যবধানে এক স্কুল ছাত্র সহ ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এ কারণে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে চান এ সব এলাকার মানুষ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার ধর্ণা দিয়েও সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত দাবি পূরণ হয়নি।শুধু প্রতিশ্রুতি মিললেও সেতুর দাবি পূরণ করেনি জনপ্রতিনিধিরা। ফলে, বাধ্য হয়ে এবার আন্দোলনে নামছেন এলাকাবাসী।

পিএমখালী ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ঠিকাদার জনাব কেফায়েত উল্লাহ বলেন, নদীর ওপাড়ের এসএম পাড়া, সিকদার পাড়া, বিডিআর ক্যাম্প, বড়ুয়া পাড়া ,এপাড়ের ছনখোলা, পশ্চিম পাড়া, নয়াপাড়া, মালিপাড়া, ঘোনাপাড়া, ভারুয়াখালী, ইউনিয়ন খুরুশকুলের হিন্দু পাড়া, রুহুল্লার ডেইল এলাকাসহ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ এই পথ দিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিদ্যালয়), হাটবাজার, অফিস-আদালতে যাতায়াত করেন।তিনি বলেন, এখানে সেতু না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে তাদের। আমরা বারবার এখানে একটি সেতু চেয়েছি। কিন্তু, আমাদের দাবি কেউ আমলে নেয়নি।

সম্প্রতি, বাঁকখালী নদীর ধারে ছনখোলা-ঝিলংজার মধ্যবর্তী ছনখোলাঘাটে একত্রিত হয়ে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয়রা। হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করেন পিএমখালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাস্টার আব্দুর রহিম।
ইউপি চেয়ারম্যান মাস্টার আব্দুর রহিম জানান, তার ইউনিয়নের বেশিরভাগ মানুষ ওই ঘাটের আশেপাশে বসবাসরত।এ এলাকার মানুষ যোগাযোগ সমস্যায় উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়েছেন। তাছাড়া প্রতিবছর একাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে ওই ঘাটে। জনস্বার্থে ওই নদী পারাপারে একটি সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।গণমানুষের দাবি বিবেচনায় তিনি দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিষয়টি তিনি অতি দ্রুত উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নিকট পৌঁছে দিবেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে, পিএমখালী-ঝিলংজা সেতু নির্মাণ হলে কি কি সুফল পাবে কক্সবাজার বাসী ? স্থানীয়রা জানায়, বাঁকখালী নদীপাড়ের জনপদ পিএমখালী, খুরুশকুলের একাংশ, ভারুয়াখালী, ঈদগাহ উত্তরাঞ্চল এবং এর সঙ্গে আছে পুরো দক্ষিণ বৃহত্তর ঝিলংজা। শহরের মূল পয়েন্ট যদি নিউমার্কেটকে ধরা হয় তাহলে সেখান থেকে দূরত্ব মাত্র ৪ থেকে ৬ মাইল। একটি সেতুর কারণে এ দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে দুই/আড়াই ঘণ্টা।

শহরের এত কাছের জনপদ পিএমখালী, খুরুশকুল, ভারুয়াখালী, অথচ এ জনপদ এখনও যেন অজপাড়াগাঁ। সেতুর একপাশে শহর-নিয়ন বাতির আলো, আরেক পাশে গ্রাম-কুপির আলোয় অন্ধকার দূর করছে মানুষ। অথচ ছনখোলা-ঝিলংজার এ ঘাটে একটি সেতু হলে এ জনপদ হবে একটি পরিকল্পিত উপশহর, একটি মডেল টাউন। এ গ্রামীণ জনপদ হবে একটি পরিকল্পিত শিল্পনগরী। নদী আর পাহাড়ের মিলনস্থল ঘিরে উঠবে দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট।

ভুক্তভোগীরা মনে করেন, বাঁকখালীর উপর যদি একটি দ্বিমুখী সেতু হয়, তাহলে কক্সবাজার শহরের উপর চাপ কমবে। কক্সবাজার শহর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন নামিয় শিল্প কারখানা স্থানান্তর হবে নদীর উত্তর পাড়ে। এমনকি কক্সবাজার শহরে এখন বলতে গেলে শিল্পকারখানা করার মত কোন জায়গা নেই। এক্ষেত্রে পিএমখালী-ভারুয়াখালী হতে পারে উত্তম স্থান। এছাড়া শহরের উপর মানুষের চাপও কমবে। যাতায়াতের সমস্যার জন্য যারা শহরে এসে ভিড় করেছেন তারা আবারও ফিরে যাবেন গ্রামে।

সচেতন মহলের মধ্যে বলতে শোনা গেছে ছনখোলা খেয়াঘাট একটি সেতু হলে সবচেয়ে যে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে তা হলো কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটবে।সাথে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। ঈদগাহ,ভারুয়খালী, পিএমখালী, কক্সবাজার টাউনের সঙ্গে যোগাযোগ একেবারে সহজ হয়ে যাবে। এতে যাবতীয় কাঁচামাল দ্রুত সরাসরি পৌঁছে যাবে বিভিন্ন স্থানে আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের পিছিয়ে থাকা বিস্তির্ণ জনপদের উন্নয়ন তো হবেই।

পিএমখালীর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here