বাঁশখালীতে চেকপোস্ট বসিয়ে শ্রমিকদের জোর করে কর্মযোগদানে বাধ্য করছে পুলিশ

মুহাম্মদ দিদার হোসাইন,
বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধিঃ
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুলিশ- শ্রমিকের সংঘর্ষের পর পরই শ্রমিকরা কর্মস্থল ত্যাগ করে বাসায় ফেরাকালীন সময়ে বাঁশখালী – আনোয়ারার বিভিন্ন স্পটে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে শ্রমিকদের আটক করে পুনরায় কর্মস্থলে যোগদানে বাধ্য করার অভিযোগ উঠেছে।

১৯ এপ্রিল (সোমবার) কয়েকজন শ্রমিকের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমরা পেটের জ্বালায় টাকা রোজগার করতে চাকরি করতে এসেছি, পুলিশের গুলিতে জীবন দিতে আসিনি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরত কিশোরগঞ্জের শ্রমিক বলেন,আমি এধরনের ঘটনা আর কখনো দেখিনি, শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ বিনা কারণে আন্দোলনরত শ্রমিকদের বুকে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পাখির মতো শ্রমিক হত্যা করার মতো ঘটনা বাঁশখালী গণ্ডামারা কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করতে এসে দেখলাম,আর কোথাও দেখিনি। আমার চোখের সামনে চারজন নিরীহ শ্রমিককে গুলি করে হত্যা করার পর এক শ্রমিকের মাথায় ইট মেরে তেতলা করে দিয়েছে পুলিশ। শ্রমিক আরো বলেন, আমারা জীবনে বেঁচে থাকার জন্য টাকার প্রয়োজন, কিন্তু মরে গেলে টাকা দিয়ে কি করবো? জীবন বাঁচাতে চলে যাচ্ছি,, কিন্তু আমাদের অনেক শ্রমিকদেরকে সড়কের বিভিন্ন স্পটে পুলিশ চেকপোস্ট বসিয়ে জোর করে ধরে কর্মস্থলে নিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

অন্য এক শ্রমিক বলেন,১৮ এপ্রিল বা ১৯ এপ্রিল যে সব শ্রমিক কর্মযোগদান করেছে তাদেরকে জনপ্রতি এক হাজার টাকা করে প্রদান করেছে বলেও জানা যায়।

১৭ এপ্রিল (শনিবার) সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনার জেরে পুলিশ ও এস আলম কতৃপক্ষ পৃথক দুটি মামলায় ২২ জনের নাম উল্লেখসহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার জনকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ ও কর্তৃপক্ষ।

২২ জনের নাম উল্লেখ পূর্বক হাজারোধিক অজ্ঞাত আসামি করে দায়েরকৃত মামলাটির বাদী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফারুক আহমেদ।ওই মামলায় শ্রমিকদের কাউকে আসামি করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার জানামতে কোন শ্রমিককে আমরা আসামি করিনি, আসামি তাদেরকেই করা হয়েছে যারা শ্রমিকদের উস্কানি দিয়ে ঘটনা ঘটিয়েছে, এবং সংঘর্ষের সময় প্রজেক্টের বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে।

শ্রমিকদের পথরোধ করে জোর পূর্বক কর্মস্থলে যোগদানে বাধ্য করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,না এটা মিথ্যা কথা, পুলিশ কিংবা আমাদের কোন কর্মকর্তা শ্রমিকদের কর্মে ফেরাতে বাধ্য করিনি, এমনকি এধরণের কোন অভিযোগ কেউ সাংবাদিকদের করলে সেটা মিথ্যা অভিযোগ, শ্রমিকরা স্বইচ্ছায় কর্মস্থলে যোগ দিয়েছে বলেও জানান ফারুক।
অপর মামলার বাদী বাঁশখালী থানা পুলিশ এস আই রাশেদুজ্জামান। ওই মামলায় অজ্ঞাত হিসেবে আসামি ২০০০-২৫০০ হাজার জনকে।
অজ্ঞাত সহ পৃথক দুই মামলায় সাড়ে তিন হাজার জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করার খবরটি ছড়িয়ে পড়লে গ্রেফতার আতঙ্কে এক পর্যায়ে পুরো গণ্ডামারায় পূরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে।

এব্যাপারে বাঁশখালী থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিউল কবির এর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি পৃথক দুটি মামলা দায়েরের বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, দুই মামলায় ২২ জনের উল্লেখ সহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামি করা হয়েছে বলে জানান।

পুলিশ গুলিতে নিহত পাঁচ শ্রমিকদের পক্ষ থেকে থানায় মামলা দায়ের করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,না, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোন মামলা এখনো পর্যন্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

সংঘর্ষের ঘটনায় আহত তিন পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আন্দোলনরত শ্রমিকরা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করার ফলে আহত হয়েছে।

বাঁশখালীতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষে ৫ জন নিহতের ঘটনায় জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আলাদা ২টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

শনিবার (১৭ এপ্রিল) বিকেলে জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান ও চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
জেলা প্রশাসক মমিনুর রহমান বলেন, ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুমনী আক্তারকে প্রধান করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কবির আহম্মেদ, কলকারখানা অধিদফতর চট্টগ্রামের লেবার পরিদর্শক মাসুদ রানা, বিদ্যুৎ বিভাগ চট্টগ্রামের সহকারী প্রধান প্রকৌশলী অভিজিৎ কুরি। কমিটিকে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

এসময় নিহত পাঁচ শ্রমিকের পরিবারকে ৩ লাখ করে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের চিকিৎসায় ৫০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ৫ জন নিহতের ঘটনায় চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেনকে। এছাড়া অন্য দুই সদস্য পুলিশ সুপার নেছার আহমেদ ্এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কবির হোসেন।

কমিটিকে আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে শনিবার (১৭ এপ্রিল) সকালে বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ৩০ জন।

উল্লেখ্য বিগত ২০১৬ সালের ৪ ঠা এপ্রিল ওই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ করার পক্ষে বিপক্ষে সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে আনোয়ার হোসেন (আঙ্গুর), জাগের আহমদ, মর্তুজা আলী ও জাকের হোসেন সহ ৪ জন নিহত হয়েছিল, এখন পুরো গণ্ডামারা- বড়ঘোনা জুড়ে গ্রেফতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। এখন স্থানীয় জনমনে একটাই প্রশ্ন: এস আলম কোম্পানি ও চায়নার যৌথ উদ্যোগে নির্মাণাধীন কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রীক আর কত ঘটনা ঘটবে? আর কত মায়ের বুক খালি হবে?

নিরীহ মানুষ আর কত হয়রানির স্বীকার হবে?
এটা কি বিদ্যুৎ কেন্দ্র? নাকি লাশ কেন্দ্র? আর কত মায়ের বুক খালি হলে এই লাশ কেন্দ্রটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পরিণত হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here