শনিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর - ২০২১
শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২১
আরও

    আগামীকাল ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি দিবস

    থুইচিমং মারমা, মহালছড়ি প্রতিনিধি:
    পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য ২রা ডিসেম্বর দিনটি শুধুমাত্র একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নির্দেশিত সংখ্যা নয়, দিনটি পাহাড়িদের দুই যুগেরও বেশি প্রতীক্ষিত একটি সংযোগহীনতায় নিভে যাওয়া শান্তির ঝিলিক। সেই ২রা ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি দিবসটি হয়ত সময়ের নিত্য আবর্তিত হয়ে চক্রপরিক্রমায় আসবে যাবে কিন্তুু বর্তমান সময়ে শান্তিচুক্তি দিবসটি একটি মুখে-কথা বা টকশো বার্তা হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে যা চুক্তি বাস্তবায়নের কোন আশার আলো ফোটে উঠেনা। এই শান্তিচুক্তি ২৩ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে, চুক্তি বাস্তবায়নের ব্যাপারে পাহাড়িদের মনে সন্দিহান ও উৎকন্ঠা কমেনি বরং বর্তমান সময়ে কয়েকগুন বেড়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের মনে এই উৎকন্ঠা গুলো প্রকাশ পেয়েছে পার্বত্য এলাকায় সমসাময়িক সময়ে সংগঠিত সংঘাত ও সংর্ঘষের মধ্য দিয়ে। এই পার্বত্য শান্তিচুক্তি দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও সরকার বাস্তবায়নের নামমাত্র করে চুক্তিধারাকে সংবিধানে সাংর্ঘষিকরূপে রূপায়িত করে রেখেছে বলে অনেকের অভিমত।

    ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ ঘটে। এই স্বাধীন বাংলাদেশের তিনটি পাহাড়ি অধ্যুষিত জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান যা পার্বত্য চট্টগ্রাম নামে পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা,মারমা,ত্রিপুরা, চাক,বম,ম্রো,তচঙ্গ্যাসহ ১৩ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে সংবিধান রচনাকালে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে এদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি ফলে আদিবাসী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তা নিয়ে ঘোর বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি তৎকালীন রাষ্ট্র প্রধানের সাথে এ বিষয়ে সাক্ষাৎ করেন এবং পার্বত্য স্বায়ত্তশাসন ও পাহাড়ীদের অধিকার স্বীকৃতি দাবি করেন কিন্তু ফলপ্রসূ না হওয়ায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ১৯৭৩ সালে মার্চ মাসে পার্বত্য আদিবাসীদের নিয়ে পিসিজেএসএস নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তুু ১৯৭৫ এর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সপরিবার হত্যাকান্ড হওয়ার পর তাঁর দাবি পূরনের আশা হারিয়ে তিনি ভারতে চলে যান। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এই দুবছরে তিনি পিসিজেএসএস কে একটি শক্তিশালী সামরিক শাখারূপে বের করেন। ১৯৭৭ সালে সেনাবাহিনীর একটি টহল গাড়ি ওপর সশস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে পিজেএসএস এর শান্তি বাহিনীর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল।

    ১৯৭৭ সালে শুরু হওয়া সেনা সামরিকের সাথে শান্তি বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘাত-সংঘর্ষ দীর্ঘ ২০ বছর পর ১৯৯৭ সালে ২রা ডিসেম্বর তৎকালীন সরকারের সাথে পিজেএসএস শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইতি ঘটেছিল। এই শান্তিচুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং শান্তিবাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(পিজেএসএস) এর নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তুু লারমা।

    শান্তিচুক্তি ২৩ বছর পার হতে চলেছে কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার ও জেএসএস এর মধ্যকার দূরত্ব এখন গোল টেবিল থেকে সরে পারস্পরিক দোষারোপের রং মাখামাখিতে ব্যস্ত হতে দেখা যায়। এতে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উভয়পক্ষ পরস্পরের আস্থাহীনতাকে দিন দিন ত্বরান্বিত করে ফেলেছে। ফলে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ফলপ্রসূ পদক্ষেপগুলি সম্পাদন করতে দীর্ঘ হতে আরো দীর্ঘায়িত হতে চলেছে। এ দিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে চুক্তির ৭২টি ধারা থেকে ৪৮ টি ধারা সম্পূর্ণ ও ১৫টি ধারা আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং বাকী ধারাগুলি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াধীন আছে। অপরদিকে জনসংহতি সমিতির নেতারা বলছেন, চুক্তির মূল ধারাগুলোসহ ৪৭ টি ধারা বাস্তবায়ন করা হয়নি। দুই পক্ষের এই গরমিল বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বুঝা যায় এই শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের প্রতি এই দু’পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও বিশ্বাস কতটুকু ফাটল ধরেছে।

    পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীরা মনে করেন যে, শান্তিচুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে। এর জন্য সরকারকে সদিচ্ছার সাথে আগে এগিয়ে আসতে হবে এই চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়ন করার জন্য। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার অতিদ্রুত এগিয়ে না আসলে এ চুক্তিপত্র পরবর্তী প্রজন্মের কাছে একটি কুয়াশাছন্ন শিশিরের সিক্ত-ভিজাকাগজ রূপে আস্তে আস্তে বিলীন হয়ে যাবে।

    পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে পাহাড়িদের মনে যে ক্ষোভ ও অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে তার ৭টি কারন বিবিসি এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছেঃ

    ১. শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন
    দীর্ঘ সশস্ত্র লড়াই এর পর পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বাহিনীর সাথে বাংলাদেশ সরকারের শান্তিচুক্তি সই হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর। তারপর অতিক্রান্ত হয়েছে ২৩ বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু এই চুক্তির কতোটা বাস্তবায়ন হয়েছে সেটা নিয়ে আছে বড় ধরনের বিতর্ক। সরকার পক্ষ বলছে, বাস্তবায়নের কাজ চলছে। কিন্তু পাহাড়িদের অভিযোগ- চুক্তিতে তাদেরকে যেসব অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিলো তার কিছুই তারা এখনও পায় নি।

    ২. আঞ্চলিক ও পার্বত্য পরিষদের নির্বাচন
    শান্তিচুক্তি অনুযায়ী ১৯৯৭ সালের পরের বছরই গঠিত হয়েছিল আঞ্চলিক পরিষদ। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি- এই তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। কিন্তু তারপর থেকে গত দুই দশকে এসব পরিষদে একবারেরও জন্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। শুরুতে যাদেরকে সেসব পরিষদে বসানো হয়েছিল তারাই এখনও এসবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এসব পরিষদের নির্বাচন হওয়ার কথা স্থানীয় ভোটারদের হাতে। কিন্তু সেই ভোটারদের তালিকাও তৈরি হয়নি। কারা ভোটার হবেন এবং কারা হবেন না- এনিয়েও রয়েছে বিরোধ।

    ৩.ভূমি সমস্যা
    পার্বত্য চট্টগ্রামে জমির মালিকানা নিয়ে আছে বিশেষ কিছু আইন। ব্রিটিশ আমলের সেসব আইন অনুসারে ভূমির মালিকানা প্রথাগতভাবে সেখানে যারা বসবাস করে আসছে সেসব পাহাড়ি মানুষের। এসব ভূমির মালিকানার কোন দলিলপত্র নেই তাদের কাছে। কিন্তু পরে বাঙালিদেরকে যখন সেখানে নিয়ে গিয়ে তাদের জন্যে বসতি গড়ে দেওয়া হলো তখন শুরু হলো ভূমি নিয়ে বিরোধ, যাকে দেখা হয় সঙ্কটের মূল কারণ হিসেবে।
    এই সমস্যা সমাধানের জন্যে ২০০১ সালে গঠিত হয়েছিল ভূমি কমিশন। কিন্তু গত ১৭ বছরে তারা একটি বিরোধেরও নিষ্পত্তি করতে পারেনি। শুরুতে যে আইন তৈরি করা হয়েছিলো সেটা নিয়েও ছিলো অনেক সমস্যা। দেড় দশক পাল্টাপাল্টি বিতর্কের পর সেই আইনের সংশোধন হয়েছে ২০১৬ সালে। কিন্তু সেই আইন কিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে তার জন্যে যেসব রুলস বা বিধিমালার প্রয়োজন সেগুলো এখনও তৈরি হয়নি।

    সঞ্জীব দ্রং বলেন, “এই আইন সংশোধন হতেই লেগে গেল ১৫ বছর। বিধিমালা হলো না এখনও। এ থেকে বোঝা যায় যে ভূমি কমিশন কার্যকর করার ব্যাপারে সরকার কতোটা আন্তরিক।”

    ৪. সেনাবাহিনীর উপস্থিতি
    চুক্তিতে ছিল যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ছ’টি ক্যান্টনমেন্ট থাকবে। কিন্তু এর বাইরে সেখানে অস্থায়ী যতো ক্যাম্প আছে সেগুলো সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু পাহাড়িদের অভিযোগ- চুক্তি অনুযায়ী সেসব করা হয়নি।

    পাহাড়ি সংগঠনগুলোর হিসেব অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামে চারশোরও বেশি অস্থায়ী ক্যাম্প ছিল। কিন্তু তাদের অভিযোগ যে এসব ক্যাম্পের মাত্র ৩৫টি প্রত্যাহার করা হয়েছে। তারা আরো অভিযোগ করছে যে নতুন করেও সেনা ক্যাম্প স্থাপন হয়েছে।

    ৫. পাহাড়িদের বিভেদ
    শান্তিচুক্তি হওয়ার পর থেকে গত ২৩ বছর পাহাড়িদের সংগঠনগুলো নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে প্রায়শই সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায় এবং তাতে খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে।

    ৬.বাঙালিদের বসতি ও অবিশ্বাস
    সত্তরের দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দরিদ্র লোকজনকে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। শুরু হয় জিয়াউর রহমানের শাসনামলে। বলা হয় মোট পাঁচ লাখের মতো বাঙালিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের আমলেই নেওয়া হয়েছিল চার লাখের মতো। সেই সংখ্যা এখন বেড়ে কতো হয়েছে তার হিসেব পাওয়া যায়নি। তবে গবেষকরা বলেন, চার দশকেরও বেশি সময় পর পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি ও বাঙালির সংখ্যা এখন প্রায় সমান সমান।

    ৭.পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন ও দুর্গম এলাকা
    অনেকেই বলেন, সারা দেশে যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে সেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন হয়নি। দুর্গম এলাকা হওয়ার কারণে উন্নয়নের জন্যে সেখানে যে বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করার কথা ছিল সেরকমও হয়নি।

    পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিষয়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির নেতা উষাতুন তালুকদার বলেছেন, চুক্তির বেশিরভাগই বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকট কাটছে না। যে উদ্দেশ্য নিয়ে চুক্তি হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য বা আদর্শের ধারে কাছে যাওয়া কি সম্ভব হয়েছে? চুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে এখানে শান্তি আসবে না।”

    পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনমনে প্রশান্তি ফেরানোর শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নই একমাত্রপথ এখন সময়ের দাবি হয়ে ওঠেছে। অতিদ্রুত এই চুক্তি বাস্তবায়িত না হলে পাহাড়ের সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পাওয়া সংঘাত-সংঘর্ষ ও অশান্তিকে ত্বরান্বিত করবে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেছেন।

    9,705FansLike
    36FollowersFollow