‘গাছ লাগান, দেশ বাঁচান’- সাঈদী আলম

‘গাছ লাগান, দেশ বাঁচান’

সাঈদী আলম,
প্রকৃতির বৈচিত্রময় আমাদের দেশ নিয়ে আমরা অনেক কথা শুনে আসছি। গাছে গাছে সবুজ দেশ, আমার সোনার বাংলাদেশ। বাস্তবে একটি জনবসতিকে প্রকৃতির সবুজ চাদরে ডেকে রাখতে, বিশুদ্ধ অক্সিজেন পেতে যতটুকু গাছ থাকা দরকার ততটুকু কি আমাদের আছে? এটা নিয়ে দেশে অবস্হানরতদের নতুন করে বলার কিছুই নেই। একটি দেশের অধিবাসীদের স্বাচ্ছন্দ্যময় রাখতে গাছের কোন বিকল্প নেই। প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক গড়তে কমবেশী সকলে চায় বাস্তবে কতটুকু আমাদের আচরণে বলে দেয়? ঢাকা শহরে পথ বেয়ে হাটলে মাইলের পর মাইল দেখা মিলে না তেমন বর্ণনা দেয়ার মত বা গাছের ছায়ায় মনটা শীতল করার মত গাছ গাছড়া। যেদিকে তাকায় বিরাট বিরাট অট্টলিকা ছাড়া একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস বুঝি পাওয়া দুস্কর। যেখানে যানবাহন ও কারখানার কালো ধুয়া আকাশে বাতাসে প্রকৃতির সাথে মিশে গেছে। আমাদের জীবনকে বিস্বাদে পরিণত করছে। খানিকটা পরে হলেও বুঝতে পারছি বা পারবো। গাছ আমাদের কোন ধরণের প্রাকৃতিক নেয়ামত। একটি দেশের ২৫ ভাগ বনাঞ্চল আবশ্যক আমরা শুনে আসছি আমাদের সতেরো ভাগ ছিল। প্রকৃতির শত্রুরা নির্মমতার সাথে বৃক্ষ কেটে তা অনেক নিচে নামিয়ে দিয়েছে।যা আমাদের নিরাপদ আলয়কে অনিরাপদ করে তুলছে। যার ফল একটু একটু করে পেতে শুরু করছি। জলবায়ূ পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়,অতি তাপমাত্রা,খরা, জ্বলোচ্ছাসসহ নানান ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ঘিরে ধরেছে। গাছ শুধু একটি শাখা প্রশাখা বিশিষ্ট কাঠ নয়। এটি আমাদের লাইফ সাপোর্ট দিয়ে থাকে অক্সিজেন সরবরাহ করে আমরা যা ছেড়ে দেয় কার্বন ডাই অক্সাইড তা গ্রহন করে। কারণে অকারণে আমরা গাছের প্রতি নির্দয় আচরণ করি। একটু সুযোগ পেলেই কুঠার হাতে বৃক্ষের শিকড় উপড়ে ফেলি। দীর্ঘক্ষণ ক্লান্ত পথে হেঁটে যায় কামনা করি একটুখানি গাছের শীতল ছায়া। বর্তমান আমাদের উপর যখনই ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানতে চায় আলোচনার টপ লাইনে চলে আসে প্রাকৃতিক,নান্দনিক অপরুপ সৌন্দর্যের প্রতিক সুন্দরবন। নিজের বুক চেতিয়ে দিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে আমাদের সুরক্ষা দেয়। যেন মনে হয় ত্রাণকর্তার আবির্ভাব। সুন্দরবনের সৌন্দর্য সারাবিশ্বে আলোচিত এবং সপ্তাশ্চর্যের একটি। অথচ আমরা প্রকৃতির এই ডানাকে সুযোগ পেলেই অত্যাচার চালাই প্রাণীজগত ও গাছগাছড়ার উপর। আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। উচিত ছিল সৌন্দর্যের এই লীলাভূমির সৌন্দর্য বর্ধন করে আরো আকর্ষণীয় করে তুলা। যাতে প্রকৃতির এই কণ্যা যেন আরো বেশি বিমোহিত করে। বৈশ্বিক পর্যটক আকর্ষণ করতে সক্ষমতা অর্জন করে। তখনই এটার গূরুত্ব আরো বেড়েই যাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম সৃষ্টিকর্তার অপার বিস্ময়। দুর থেকে মনে হয় প্রকৃতির ডানা বিছিয়েছে পাহাড়ের উপর। পর্যটক ও প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এই নীলাচলকে বাংলায় একটুখানি স্বর্গের ভূমি হিসেবে বিবেচনায় নেয়। প্রকৃতির এই আলয়কে প্রেমিকরা খুঁনসুটি খুঁজে, ভ্রমণ পিপাসুরা চক্ষু শীতল করে। পেশাজীবিরা স্বস্তির নিঃশ্বাস পেলে। শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু শিখতে যায়। প্রাণীদের বিচরণ পর্যটককে মাতিয়ে তুলে। এরপরও দেখা যায় নিষ্ঠুর প্রেমিকরা হাতে করাত তুলে নিয়ে গাছের প্রাণ নিঃশ্বাস করে মরুভূমিতে পরিণত করছে। কেন এমন আচরণ প্রতিভাত হয় বারবার। কেউ স্বার্থের অন্ধে, কেউ অঙ্গতার বশে, হয়তো কেউ শত্রুতার জেরে, কিংবা দু বেলা আহার যোগাড়ের নিমিত্তে করেই যাচ্ছে। তারা এতো কিছু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বন বিভাগের চক্ষু ফাঁকি দিয়ে এসব কাজ করেই যাচ্ছে। চর্মচক্ষুর অন্তরালে বিরাট ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছি তা বাছ বিচার করছি না। এমন অবস্হা বজায় থাকলে শুধু যে পরিবেশের ক্ষতি হবে তা কিন্তু নয়, সুজলা সুফলা সবুজ,শ্যামলা এই বাংলাদেশ বসাবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। উপকূল প্লাবিত হয়ে তলিয়ে যাবার সম্ভবনা প্রবল হচ্ছে। প্রাণীকূল হারিয়ে যাচ্ছে মানববসতির স্হায়ীত্বকাল ক্ষীণ হয়ে আসছে। গতবছর সারাদেশে বন্যহাতির আক্রমণ জনপদে প্রাণহানি ও ফসলহানি আলোচনার টেবিলে চলে এসেছে। লোকালয়ে আসার কারণে জনচলাচল শুধু বিঘ্ন সৃষ্টি করে নি। প্রাণনাশের সম্মুখিন করে তুলেছে। এটার অন্যতম কারণ বৃক্ষনিধন করে উজাড় করে ফেলছি। তবে আমাদের আচরণ ও কর্ম প্রকৃতির বিপক্ষে না হয়ে, পক্ষ হয় তাহলে উভয় দিক দিয়ে লাভবান হতে পারি। গাছ কাটার বিপরীতে দুটি করে গাছ লাগাই। জনসংখ্যার বিপরীতে প্রতিবছর ৫ টি করেও গাছ লাগালে প্রকৃতির সাজ নতুন করে সাজবে। শুধু বৃক্ষরোপণ আমরা বৃক্ষ বিতরণও করতে পারি। অামরা অনেক কিছু বিতরণ করি, গাছ বিতরণ করতে খুব কমই দেখা যায়। এটা কিন্তু সওয়াবের কাজ। হোক ফলদি,বনদি, ঔষুধি সদকায়ে জারিয়ার মত সওয়াব প্রবাহমান থাকবে আপনার অবর্তমানেও। রাসুলে করিম (সঃ) বলেছেন, ‘আগামীকাল যদি কিয়ামতও হয় আজকে একটি গাছ লাগাও’ প্রকৃতির প্রাণ চঞ্চলতা ফিরে পেতে গাছই মোক্ষম উপাদান।

বিশ্বের অনেক উন্নত রাষ্ট্র কিন্তু পর্যটক খাতকে খুব গূরুত্ব দিচ্ছে। ইউরোপে জিডিপির ১০ % পর্যটন খাত থেকে আয় হয়। কিছু কিছু রাষ্ট্র এমন আছে অর্থনীতির চাকা ঘুরাচ্ছে পর্যটন খাত। আমাদেরও প্রবল সম্ভবনা রয়েছে বৈশ্বিক পর্যটক আকর্ষণ করতে যদি নিজেরাই প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ পরিত্যাগ করি। এখানে দেশী বিদেশী পর্যটক হুমড়ি খেয়ে পড়বে। দেশটাকে আবার সবুজের আঁচল দিয়ে ডেকে রাখি। দেশীয় অর্থনীতির চাকা সচল করি। প্রকৃতির শত্রু না হয়ে,নিঃস্বার্থ বন্ধু হই।

শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here