কারিগরি শিক্ষা: ভিত্তি এখনো নড়বড়ে!

মাসুম খান,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার। ফলে বঙ্গবন্ধু কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে ‘কুদরত-ই-খুদা’ শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। ১৯৭৫-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৮ বছর পেরিয়ে গেলেও তারপর গঠিত কোনো শিক্ষা কমিশনই আলোর মুখ দেখেনি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই কারিগরি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ ও খসড়া শিক্ষা আইন-২০১৬ প্রণয়ন করেন।

যেখানে প্রধানমন্ত্রী যথার্থই উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, যে দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যত বেশি; সেদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় তত বেশি। কিন্তু শিক্ষক সংকট, উপকরণের অভাব, অনুন্নত কারিকুলামসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের কারিগরি শিক্ষা। এছাড়াও কারিগরি বিভিন্ন বিষয়ে বিদেশে চাহিদা থাকলেও শিক্ষার মান উন্নয়নে আশাতীত কোনো উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যে দেশের কারিগরি শিক্ষার্থীদের হার মাত্র ১৪ শতাংশ। ২০৩০ সালে সেই লক্ষ্য ৩০ শতাংশ। তবে বাস্তবে আন্তর্জাতিক কারিগরি শিক্ষার সংজ্ঞা ও বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)’র তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এটি মূলত ৮.৪৪ শতাংশ।

ব্যানবেইস’র তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬ হাজার ৮৬৫টি। এরমধ্যে সরকারি ৮৬৬টি ও বেসরকারি ৫ হাজার ৯৯৯টি। শিক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৪ জন। এতে যুক্ত করা হয়েছে ৬ মাস মেয়াদী বিভিন্ন শর্ট কোর্স। এই কোর্সের আওতাধীন ২ হাজার ৬শ’ টি ট্রেনিং সেন্টার। আর এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ২ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষার্থী। এই শিক্ষার্থীদের আলাদা করলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হয় ১৩ লাখ ৪৭ হাজার ৭৮৫।

আবার নবম থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত কারিগরির আওতায় অধ্যয়ন করে এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৪ শতাংশ। কিন্তু এসব সার্টিফিকেট কোর্স আন্তর্জাতিক কারিগরির শিক্ষার আওতায় পড়ে না। আবার কারিগরি শিক্ষার অধীনে রয়েছে ২ হাজার ৬১৭টি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট (বিএম) স্কুল ও কলেজ। এসব শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন করতে সেগুলো রয়েছে ব্যবসায় বিজ্ঞান শাখায়। এটিও কোনভাবেই কারিগরি শিক্ষার আওতায় পড়েনা। এছাড়াও শিক্ষামন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে ডা. দীপু মনি বলেন, বিএম কলেজ নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ে কারিগরি কোন জ্ঞান পাচ্ছেন না শিক্ষার্থীরা।

কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের উপ-পরিদর্শক পরিচালক ড. ইন্দ্রানী ধর বলেন, আমাদের শর্ট কোর্সগুলো দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩ হাজার। আমাদের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সমস্যা হয়। তবে আমরা এই সমস্যা দুর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের সদ্য একটি বৈঠক হয়েছে এতে আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাদের একসঙ্গে করে প্রথমবার বসতে যাচ্চি।

কারিগরি শিক্ষার হার: তথ্য বলছে, বর্তমানে কারিগরি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৫৯ জন। এই হিসেবে কারিগরিতে শিক্ষার হার ৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ। যেখানে জর্মানিতে ৭৩ শতাংশ, জাপান ৬৬, সিঙ্গাপুর ৬৫, অস্ট্রেলিয়া ৬০, চীন ৫৫, দক্ষিণ কোরিয়া ৫০, মালয়েশিয়ায় ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছেন কারিগরি মাধ্যমে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারিগরি শিক্ষা ও গবেষণা গবেষক বলেন, সরকারের দেয়া এই হার সঠিক নয়। কারণ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এক নয়। বৃত্তিমূলক শিক্ষার পরের ধাপ কারিগরি শিক্ষা। সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে এক করে হিসাব করছে। এতে কারিগরির প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না।

করিগরিতে নারী শিক্ষার্থীদের অবস্থান: আবার ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী করিগরিতে নারী শিক্ষার্থীদের অবস্থান অনেকটাই পিছিয়ে। মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৬২ জন; ২৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। আর মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৫০ হাজার ৯৩১ জন। নারী শিক্ষকের সংখ্যা ১০ হাজার ২১২ জন। ২০ দশমিক ০৫ শাতংশ মাত্র।

কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন: সরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চলছে সংকট।চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনিষ্টিটিউটের একজন শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের শিক্ষকরা অধিকাংশই চুক্তিভিত্তিক। নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছেন অল্প কিছু শিক্ষক রযেছেন নিয়মিত। এসব শিক্ষকের দ্বারা আমরা খুব একটা উপকার পাচ্ছি না। এছাড়াও আমাদের প্র্যাকটিকাল উপকরণের অধিকাংশই ব্যবহার অনুপযোগী। যেমন, জ্য ক্রাশার, হ্যামার মিল, বল মিল ইত্যাদি। এসব গুরত্বপূর্ণ উপকরণ ছাড়াই প্রাকটিক্যাল করতে হচ্ছে আমাদের।

বেসরকারি পলিটেকনিক্যালের অবস্থা: এখানের অবস্থা আরো ভয়াবহ। ল্যাব থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। এছাড়াও তারা প্রাকটিক্যালের জন্য নেই বাড়তি উপকরণ। তারা চলছে নাম সর্বস্ব অবস্থায়। বেসরকারি পলিটেনিকের একজন শিক্ষার্থী ফাহিম। তিনি বলেন, আমরা পলিটেকনিক্যালে পড়ছি মুখস্ত বিদ্যা নিয়ে। এখানে নেই কোন মানের শিক্ষক। নেই কোন প্র্যাকটিকাল উপকরণ। এটাকে টাকা দিয়ে সার্টিফিকেট কেনা বললেও খুব একটা ভুল বলা হবে না। এসব প্রতিষ্ঠানের কারিকুলামের অবস্থাও প্রতিষ্ঠানের মতোই। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে না এসব কারিকুলাম।

কারিগরি শিক্ষায় পুরেনো কোর্স: এখনো পুরেনো কোর্স থাকায় চাকরির বাজারেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। যেমন ডিপ্লোমা ইন মাইনিং। কিন্তু খনিজ সম্পদ আহরণে এই প্রশিক্ষত শিক্ষার্থীরা চাকরির বাজারে চাহিদা না থাকায় এই বিষয়ে পড়ে কোন কাজে আসছে না।

বিশ্বে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব: কারিগরি শিক্ষাকে জোড় দিয়েছে ব্যাপক। চীন কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারে খুবই তৎপর দেশগুলোর একটি। ২০০১ সালে চীনে ১৭ হাজার ৭৭০ টি কারিগরি প্রতিষ্ঠান ছিলো। যাতে অধ্যয়নরত ছিলেন ১ কোটি ১৬ লাখ ৪২ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করতেন। তাদের কারিগরি শিক্ষার প্রসারের ফলে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের পণ্য।

বিদেশি বাজারে আমাদের অবস্থান: মালয়েশিয়ায় ইলেকট্রেশিয়ান হিসেবে প্রায় ৬ বছর ধরে কাজ করেন ফখরুল। তিনি বলেন, আমি এখানে এসে কাজ শিখেছি। অন্যান্য দেশ থেকে যারা আসেন তারা কাজ শিখে আসেন। যার কারণে তাদের বেতন আমাদের থেকে দ্বিগুণেরও বেশি। দীর্ঘ দিন কাজ করবার কারণে আমরা তাদের থেকেও অধিক দক্ষ। কিন্তু তারপরেও তাদের অধীনে কাজ করতে হয় আমাদের। তিনি আরো বলেন, এখানে দক্ষ শ্রমিকের অনেক বেতন। মেলে সুবিধা। এখানে দক্ষ হয়ে আসছে ভারত, নেপাল, পাকিস্তান থেকে। কিন্তু এই বাজারটা ধরতে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা।

কারিগরি শিক্ষায় অনাগ্রহের কারণ: এরমধ্যে অন্যতম এসএসসি পাশের পর এইচএসসি’তে পড়তে হয় ২ বছর। আর ডিপ্লোমা কোর্স করতে হয় ৪ বছরে। সেইসঙ্গে সরকারিভাবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ কম থাকায় আগ্রহ হারাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। আর রয়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েরর সঙ্কট। শুধু রয়েছে একটি মাত্র ঢাকা ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (ডুয়েট)। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও বেশির ভাগের পক্ষে আর্থিক কারণে তা সম্ভব হয় না।

কারিগরি কারিকুলাম বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন: কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ (দাখিল ভোকেশনাল) প্রকৌশলী ফারুক রেজা বলেন, আমাদের প্রধান সমস্যা আমরা যথেষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা পাই না। ফলে আমাদের অবকাঠামো নির্মাণে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিয়েছে। ল্যাবরেটরির সমস্যার পাশাপাশি একটি সমস্যা হচ্ছে বিশ্ব এতোটা এগিয়ে গেছে যে নতুন সরঞ্জাম আনার কয়েক বছর পরেই সেটি পুরনো হয়ে যাচ্ছে।

কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আলী আকবর বলেন, আমরা অনেক কাজ হাতে নিয়েছি যা থেকে কারিগরি শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে গুনগত মান বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here