কক্সবাজারে খাদ্য বান্ধব চাল বিক্রিতে এক ডিলারের বিরুদ্ধে নয়’ছয়ের অভিযোগ

এম এ সাত্তার, কক্সবাজার:
কক্সবাজার সদরের পিএমখালী ইউনিয়নের খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির ডিলার জহির উদ্দিনের বিরুদ্ধে সরকারের ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রিতে নানা অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে ট্যাগ অফিসারদের দায়সারা দায়িত্বে অনেক ডিলার চাল বিক্রিতে নানা অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। চাল বিতরণে দিনক্ষণ অনেকে অজানার কারণে চাল নিতে আসবে না এমন ব্যক্তি ও মৃত ব্যক্তির নামে চাল বিক্রি দেখিয়ে ডিলারেরা সরকারি চাল মজুদ করে বাইরে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ অহরহ।

জানা গেছে, কক্সবাজার সদর উপজেলার ১০ ইউনিয়নে খাদ্য বান্ধবের ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রির জন্য উপজেলা প্রশাসন ২২ জন ডিলার নিয়োগ করে। এই চাল বিক্রির অনিয়ম ঠেকাতে একটি কমিটি গঠন করা হলেও তাদের দায়িত্বে অবহেলা ও অদক্ষতার কারণে চাউল আত্মসাৎ ও চুরি ঠেকাতে বরাবর ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে।

বছরের শুরুতেই খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির চাউল বিতরণ কালে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ইউনিয়ন সমূহের ডিলারদের বিরুদ্ধে পত্র-পত্রিকা ও সোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র পাওয়া যাচ্ছিল। এরই মধ্যে গত সপ্তাহে সদরের পিএমখালী ইউনিয়নের ২ ডিলারের এক ডিলার নূর মোহাম্মদ সরকারি চাল গোপনে পাচারকালে এলাকার সচেতন মানুষের হাতে ধরা পড়েন। পরে বিষয়টি প্রকাশ হলে থানা পুলিশ এসে তা বাজেয়াপ্ত ও তার বিরুদ্ধে মামলা করেন।

এরপর খাদ্য বিভাগের তদন্ত টিমের লোকজন তার বিরুদ্ধে চাল পাচার ও বিক্রিতে অনিয়ম পেয়ে ৭২ হাজার টাকা (পাচারকৃত চালের একক মুল্যে নির্ধারণ করে তার দ্বিগুণ মুল্যে) জরিমানাও করা হয়েছে। আর জহির উদ্দিন নামে এক ডিলার প্রকাশ্য দুর্নীতি করলেও রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে এলাকার অসংখ্য কার্ডধারী অতিদরিদ্র মানুষ,স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।

একটু পূর্বের কথা:- শুরুতে পিএমখালী ইউনিয়নে ১০ টাকা চাউল বিক্রির (খাদ্য বান্ধব কর্মসূচি) দুজন ডিলার হলো নুরুল আবছার, সে চাউল বিতরণ করত নূর মোহাম্মদ চৌধুরী বাজার থেকে এবং অন্যজন নুর মোহাম্মদ বিতরণ করত চেরাংঘর বাজার থেকেই।গতবছর নুরুল আফসার এর বিরুদ্ধে একটি সিন্ডিকেট পূর্ব পরিকল্পিত ভাবে মোটা অংকের জরিমানা ও তার ডিলারশীপ বাগীয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের সহকারি পরিচালক এএসএম মাসুদ উদ দৌলা’র কার্যালয়ে (ডিলার নুরুল আবছার) চাউলের পরিবর্তে আটা বিক্রির অভিযোগ দায়ের করেন।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে সহকারি পরিচালক এএসএম মাসুদ উদ দৌলা উক্ত নূর মোহাম্মদ চৌধুরী বাজারে হাজির হয়ে ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে শাস্তি স্বরূপ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে নগদ আদায় করে নেয়। এরপর তার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে কেমনে কী করে তার কাছ থেকে ডিলারশিপও বাতিল করিয়ে বাগিয়ে নেন ওই সিন্ডিকেট। সেই থেকে নুরুল আবছার এর পরিবর্তে সিন্ডিকেট সদস্য পরনিয়াপাড়া এলাকার জহির উদ্দিনকে ডিলারের দায়িত্ব দেয়া হয়।

এরপর থেকে কথিত ডিলার জহির পিএমখালী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে একটি দোকানে সরকারি চাল মজুদ করে তার ইচ্ছেমত যাকে ইচ্ছা সপ্তাহে ২/১ দিন বিতরণ করেন। প্রায় সময় দোকান বন্ধ রাখেন।কার্ডধারী মানুষ চাউলের জন্য গেলেও দোকান খোলা না পেয়ে ফেরত চলে যান। কোন রকম মাস পার করে দেয় সে। এভাবে মাস শেষ অব্দি একাধিক কার্ডধারী মানুষের চাউল গোপনে কালোবাজারে বিক্রি করে আসছে জহির।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কার্ডধারী জানান, তারা জানেন না কোন মাসের কত তারিখে সরকারি চাউল বিতরণ করা হবে বা হচ্ছে । লোকের মাধ্যমে জানতে পেরে চাউলের জন্য গেলে দোকান খোলা পাওয়া যায় না। মোবাইল করলেও মোবাইল রিসিভ করেনা। পথের মধ্যে কোন সময় দেখা সাক্ষাৎ হলে চাউলের কথা জানালে বলেন চাউল বিতরণ শেষ হয়ে গেছে। মাস শেষ হতে আরো ১৫/১৬ দিন বাকি আমাদের কার্ডের চাউল কোথায় গেলো জিজ্ঞাসা করলে জানান আমি ২/১ দিনের ভিতর চাউল বিতরণ করে ফেলেছি। চাউল বিতরণের সময় যারা সময় মতো চাউল নিয়ে যায়নি তাদের চাউল সরকারকে ফেরত দিয়ে আসি।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে জহির উদ্দিন বলেন, কার্ডধারী যে কেহ আসলে চাল দিয়ে দেন। কেউ চাউল না নিয়ে গেলে তার করার কিছু নেই। অবিক্রিত চালের হিসাব সে সরকারকে বুঝিয়ে দিয়ে আসেন।

এছাড়াও পৌরসভার বাহারছড়ায় আবদুল গফুর ডিলার, উপজেলা বাজারের পাশে মোঃ আবুল কাশেম ডিলারের, রামু উপজেলার কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের দৌছড়ি নারিকেল বাগান এলাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিলার ও ইউনিয়ন যুবলীগের আহবায়ক নজরুল ইসলাম, গর্জনিয়ার ৫ নং ওয়ার্ডের জাউচ পাড়ার ডিলার ও ইউনিয়ন যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সাকেরের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ উঠছে।

চলিত বছরের মার্চ থেকে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ডিলারদের দোকানে চাল বিক্রি শুরু হয়। অভিযোগ উঠে উপজেলা প্রশাসনের নিযুক্ত তদারকি অফিসারেরা ডিলারের দোকানে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় কোন কোন ডিলার চাল বিক্রিতে ব্যাপক অনিয়ম করে যাচ্ছে।
নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে পুরো দেশ এখন কার্যত লকডাউন। এমন অবস্থায় চরম দুর্ভোগে পড়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। তারমধ্যে দিনমজুর শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের মানুষেরা অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

এমনিতেই বছরের ১২ মাসের কয়েকটি মাস বিশেষ করে মার্চ, এপ্রিল, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ,নভেম্বর মাস সমুহে নিম্ন আয়ের মানুষের কাজকর্ম কমে গিয়ে অর্থ কষ্টে থাকেন, সেই সময়ে ১০ টাকা দরে চাউল কিনে মানুষ যেন জীবন মান বাঁচাতে পারেন সেই অসময়ের কথা মাথায় রেখেই গত কয়েক বছর ধরে নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ১০ টাকায় চাল বিক্রির নিয়ম চালু করেছে সরকার। সরকারের এই যুগোপযোগী খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৫০ লক্ষ অতিদরিদ্র মানুষ উপকার ভোগী রয়েছে। এই, ওএমএস কর্মসূচির জন্য বছরে প্রায় ৭ লক্ষ ৫০ হাজার মেট্রিকটন চাউল প্রয়োজন হবে।

এই ধারাবাহিকতায় চলিত বছরের মার্চ থেকে ১০ টাকার চাল বিক্রি শুরু করছে সরকার। কিন্তু এই চাল বিতরণকালে নানা অনিয়মের অভিযোগ করে আসছে ভূক্তভোগীরা। বিধিবহির্ভূতভ ভাবে ডিলার নিয়োগ ও নিয়োগে প্রভাবশালীদের স্বজনপ্রীতি, স্থানীয় নেতাদের যোগসাজশে ডিলার কর্তৃক চাল আত্মসাৎ, প্রকৃত কার্ডধারীদের চাল বিতরণ না করে গোপনে বিক্রি করে দেওয়া, কালোবাজারে চাল বিক্রির জন্য নিজস্ব গুদামে চাল সরিয়ে রাখা,স্বজনপ্রীতি সহ নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে দায়িত্ব প্রাপ্ত ডিলারদের বিরুদ্ধে।

এ ব্যাপারে পিএমখালীর ট্যাগ অফিসার মোহাম্মদ হানিফ মিয়া’ ডিলার জহিরের বিরুদ্ধে স্থানীয় মেম্বার ও অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়ে আসছেন বলে স্বীকার করে বলেন, পিএমখালী ইউনিয়নের সকল মেম্বারদের উপস্থিতিতে তাকেসহ অন্য ডিলার নূর মোহাম্মদকে দেখে নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।পরবর্তীতে এরকম কোন অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন।

সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাহামুদ উল্লাহ মারুফকে এ বিষয়ে অবহিত করা হলে তিনি বলেন এই করোনা মহামারীতে মানুষ কিছু চাল ডাল পেয়ে আগে বেঁচে থাকুক। অবস্থা স্বাভাবিক হয়ে গেলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তদন্ত পূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here